গণভবনের দাওয়াতে যাওয়া না যাওয়া

প্রকাশিত: ৪:০৯ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১১, ২০১৯

গণভবনের দাওয়াতে যাওয়া না যাওয়া

সানডে সিলেট ডেস্ক: সোমবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০১৯ : আকাশ আর ভূপৃষ্ঠের দুরুত্ব যেমন, ভারতের কংগ্রেস এবং আরএসএস’র দুরত্ব তেমনই। খুব বেশি বাড়িয়ে বলা হবে কি? আবার দুই দলের সম্পর্ককে যদি সাপে নেউলে বলে আখ্যায়িত করা হয়। সেটাও বা কতটা ভুল হবে? কংগ্রেসের পরিচিতি ধর্ম নিরপেক্ষতার সংগঠন হিসেবে এবং আরএসএস হচ্ছে হিন্দুবাদী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী। দ্বিমত কারো নেই এই বিষয়ে।

কথা হচ্ছে- সেই কংগ্রেসের কোনো বিখ্যাত নেতা যদি আরএসএস’র কোনো অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত হন, তখন? আর সেটা যদি হয় সাম্প্রদায়িকতার আদর্শ শিক্ষা দেওয়ার কোনো অনুষ্ঠান? এবার নিশ্চয়ই কারো পক্ষে সহজে মেনে নেয়া সম্ভব হবে না। সেই ঘটনাটিই ঘটেছে, ভারতে।

ভারতের নাগপুরে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএস এর প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত তাদের বার্ষিক ‘শিক্ষা বর্গ’ প্রশিক্ষণ শিবিরে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হলো ভারতের অত্যন্ত সন্মানীয় সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জীকে। যিনি কংগ্রেসেরও শীর্ষ পর্যায়ের একজন নেতা ছিলেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবেও তিনি নিকট অতীতেরই। হয়তো অবস্থানগত কারণে প্রণব বাবু আর কংগ্রেসের দলীয় কোনো পদে নেই। কিন্তু তিনি যে কংগ্রেসের মানুষ এবং অনানুষ্ঠানিকভাবে দলেরও পরামর্শক তা তো স্বীকার করতেই হবে। তারপরও আবার প্রণব বাবুর কন্যা এখন কংগ্রেসের অন্যতম একজন নেত্রীও বটে। সব ভুলে তিনি চলে গেলেন আরএসএস এর দাওয়াত রক্ষায়। আরএসএস এর অনুষ্ঠানে প্রণব বাবুর উপস্থিতি নিয়ে যে আলোচনা-সমালোচনা হয়নি, তা নয়। কিন্তু সেই কংগ্রেসেরই নেতারা প্রকাশ্যে বললেন, দেখলে তো, প্রণববাবু সেখানে গিয়ে আরএসএস এর মুখোন্মোচনই করে দিয়ে এসেছেন।

আলোচনা সমালোচনা হোক কিংবা না হোক, এই সৌজন্যবোধটাকে দেখতে হবে। সেখানে যাওয়ায় কংগ্রেসের কিংবা ব্যক্তিগতভাবে প্রণব বাবুর ক্ষতি হয়েছে এমনটা বলার সুযোগ কম। বরং রাজনৈতিক বৈপরিত্য থাকার পরও পারস্পরিক সম্পর্ক রক্ষায় এর গুরুত্ব বিবেচনায় আসবেই। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে আদর্শিক এবং গঠনমূলক। তা যদি ব্যক্তিগত আক্রোসের মধ্যে গিয়ে পৌঁছায় তাহলে দল বা ব্যক্তির চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয় দেশ।

এই উদাহরণটির সঙ্গে আমাদের দেশের অবস্থা যদি মিলিয়ে দেখি কেমন হবে। ২ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী সরকারি ও বিরোধী দলের নেতাদের গণভবনে দাওয়াত করলেন চায়ের। উদ্দেশ্য স্পষ্ট- রাজনৈতিক দলগুলোর শুভেচ্ছা বিনিময়। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট সেখানে গেলো না। বরং উল্টো দুই কথা শুনিয়ে দিলো সরকার ও সরকারি দলকে। যাতে মনে হতে পারে আজই তারা রাজনৈতিক ধাক্কা দিয়ে সরকার বদল করে দেওয়ার মতো ক্ষমতার অধিকারী। অথচ তাদের নির্বাচন কেন্দ্রিক যে ক্ষোভ সেই ক্ষোভটুকু ঝেরে দেওয়ার সুযোগটি কিন্তু সেখানে তারা পেতো। হোক না অনানুষ্ঠানিক তবুও সামনা সামনি বলার সুযোগটা যে সংবাদযোগ্য হতো তা কি বলার অপেক্ষা রাখে? তারা সেই সুযোগটি গ্রহণ করেনি। যেমন আগেও এমন সুযোগকে তারা প্রত্যাখ্যানই করেছে।

খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি যখন জামায়াতের সহযোগিতায় জ্বালাও পোড়াও আন্দোলনে ব্যস্ত ছিলেন তখনো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেই টেলিফোন সংলাপটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষের কানে ঢুকেছে। আর গণমাধ্যমও তা প্রচার করেছে। যা ইতিহাসের উপকরণ হিসেবে আওয়ামী লীগের কাছে গণ্য হয়ে আছে। খালেদা জিয়া যে সংলাপ বা রাজনৈতিক সমঝোতাকে পছন্দ করেন না এটা স্পষ্ট। পরবর্তীকালেও এর প্রমান পাওয়া যায়।

নির্বাচনের আগেও গুলশানের একটি রেস্তোঁরায় আওয়ামী লীগের নেতারা সময়মতো উপস্থিত হলেন, মির্জা ফখরুল ইসলাম সাহেব দাওয়াত গ্রহণ করার পরও তিনি সেখানে উপস্থিত হলেন না। যদিও সেটি ছিলো একটি বিদেশি দূতাবাসের দাওয়াত। কিন্তু এজেন্ডা ছিলো দুই বড় দলের সাধারণ সম্পাদক পর্যায়ের নেতাসহ সিনিয়র নেতাদের একসঙ্গে বসা। এবং দুই পক্ষের দুরত্ব কমিয়ে আনার চেষ্টা করা। বিএনপি স্থায়ী কমিটির একাধিক নেতা সেখানে উপস্থিত হলেও তাদের পক্ষে দলের প্রতিনিধিত্ব করা সম্ভব হলো না। ভেস্তে গেলো বিএনপির অসহযোগিতায়। এদিকে মির্জা সাহেব বললেন তিনি অসুস্থ হওয়ার কারণে যেতে পারেননি। যদিও তিনি একইসময় রাজনৈতিক কর্মসূচি ঠিকই পালন করেছেন।

কিন্তু বিএনপি যখন সংলাপের দাবি জানিয়েছে শেখ হাসিনা দলীয় প্রধান হিসেবে তাকে সাদরে গ্রহণ করেছেন। এবং তিনি তার আয়োজনও করেছেন। গত নভেম্বরে বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হলো সরকারের কাছে। তারা সংলাপে বসতে চান। কালক্ষেপণ না করে প্রধানমন্ত্রী তাদের পাল্টা চিঠি দিলেন, গণভবনে আতিথ্য গ্রহণ করার জন্য। অত্যন্ত খোলামেলা আলোচনা হলো সেখানে। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে যারা বক্তব্য রাখতে চেয়েছেন এবং যতটা সময় চেয়েছেন সবই বাস্তবায়ন হয়েছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা ড. কামাল হোসেন গণভবন থেকে বেরিয়েই বললেন, সন্তোষজনক। কিন্তু বিএনপি বলল- অন্তসারশুন্য আলোচনা।

কথা হচ্ছে- তারা সংলাপের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে, প্রধানমন্ত্রী তাতে সায় দিয়েছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী যখন তাদের আহ্বান জানিয়েছেন তখন তারা অসম্মত হয়েছেন। মানে হচ্ছে আওয়ামী লীগ যখন আহ্বান জানাবে তখন তাদের মানা করতে হবে। এটাই হচ্ছে তাদের রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য।

গণতান্ত্রিকভাবে দুটি দল পরস্পর বিরোধী অবস্থানে থাকবে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু যদি ব্যক্তিগত পর্যায়ে তা চলে যায় তখন গণতন্ত্রই ক্ষতিগ্রস্থ হয়। সেই সংস্কৃতি কি আমাদের দেশের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হবে না?

আদর্শিকভাবে চরম বৈপরিত্ত থাকার পরও প্রণব মুখার্জী যদি আরএসএস এর অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারেন, তাহলে অন্যরা তাকে অনুসরণ করতে পারে না কেন? হোক না ভিন্ন দেশের এই চিত্র। ভিন্ন দেশের ভালো বিষয়গুলো কি আমরা গ্রহণ করতে পারি না? সেই সংস্কৃতি কবে চালু হবে আমাদের দেশে?

লেখক:মোস্তফা হোসেইন, সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক।

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সর্বশেষ

ই-মেইল :Sundaysylhet@Gmail.Com
মোবাইল : ০১৭১১-৩৩৪২৪৩ / ০১৭৪০-৯১৫৪৫২ / ০১৭৪২-৩৪৬২৪৪
Designed by ওয়েব হোম বিডি