স্পেশাল

গণহত্যার প্রমাণ নষ্ট করছে মিয়ানমার

প্রকাশিত: ৫:২৫ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২২, ২০১৮

গণহত্যার প্রমাণ নষ্ট করছে মিয়ানমার

সানডে সিলেট ডেস্ক : বৃহস্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ : মিয়ানমার গণকবরগুলো বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে গণহত্যার প্রমাণ নষ্ট করে ফেলছে।মিয়ানমার গণকবরগুলো বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে গণহত্যার প্রমাণ নষ্ট করে ফেলছে।

বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা বলছে, রাখাইনে গণহত্যার প্রমাণ নষ্ট করছে মিয়ানমার।
১০০ জনের বেশি ব্রিটিশ এমপির ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্টে মিয়ানমারের শীর্ষ জেনারেলের বিচার দাবি।

রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা গণহত্যার সব প্রমাণ মুছে ফেলতে চাইছে মিয়ানমার। গত বছরের আগস্ট মাসে এ গণহত্যা চালানো হয়। রোহিঙ্গাদের একটি গণকবরে বুলডোজার চালিয়ে তা নিশ্চিহ্ন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে একটি মানবাধিকার সংস্থা। মানবাধিকার সংস্থার ওই অভিযোগ ছাড়াও বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) নিজস্ব অনুসন্ধানে মিয়ানমারে অন্যান্য গণকবরের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

রাখাইনে রোহিঙ্গাদের নির্যাতনের ওপর ডকুমেন্টারি নিয়ে কাজ করছে ‘দ্য আরাকান প্রজেক্ট’। ওই প্রকল্প থেকে ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ানে একটি ভিডিও সরবরাহ করা হয়েছে। ওই ভিডিও ফুটেজে জঙ্গল নিশ্চিহ্ন করে ফেলা ও গণকবর গুঁড়িয়ে দেওয়ার দৃশ্য দেখা গেছে। ভিডিওতে অর্ধেক মাটিচাপা দেওয়া ত্রিপল ব্যাগে মানুষের গলিত পা দেখা গেছে। গত মঙ্গলবার গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।

প্রকল্পের পরিচালক ক্রিস লিউয়া বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমে গণহত্যার খবর প্রকাশিত হয়েছে। এখন গণহত্যার প্রমাণ স্থায়ীভাবে মুছে ফেলতে বুলডোজার চালাতে দেখা যাচ্ছে। মিডিয়াতে যে দুটি গণকবরের খবর এসেছে, তার মধ্যে গত বৃহস্পতিবার একটি গণকবরের ওপর বুলডোজার চালানো হয়েছে। এর অর্থ, সেখানে গণহত্যার সব প্রমাণ নষ্ট করে ফেলা হয়েছে।

লিউয়া জানান, বুলডোজার চালানোর কাজটি করছে মিয়ানমারের একটি প্রাইভেট কোম্পানি। প্রতিষ্ঠানটি রাখাইনের নয়। মিয়ানমারের মধ্যাঞ্চল থেকে এসে তারা এ কাজ করছে।

‘দ্য আরাকান প্রজেক্ট’ পরিচালক বলেন, ‘এটি থেকে স্পষ্ট যে সরকারি আদেশেই গণহত্যার চিহ্ন মুছে ফেলা হচ্ছে।’

মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, গত বছরের আগস্ট মাসে গণহত্যা চালানোর স্থানটি হচ্ছে উত্তর রাখাইনের বুথিডাং শহরের মং নুতে। সেখানে গণকবরটির অবস্থান।

মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) বলছে, রাখাইন থেকে বেঁচে ফেরা লোকজন তাদের বলেছে, গ্রামের বসতবাড়ির আঙিনায় জড়ো হওয়া গ্রামবাসীর ওপর মিয়ানমারের সেনারা নির্যাতন করেছে। এ ছাড়া ধর্ষণ, খুন ও নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে। সেখানে এক ডজনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।

এইচআরডব্লিউর কাছে থাকা স্যাটেলাইটের ছবিতে দেখা গেছে, মং নু এলাকাটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

গত বছরের ডিসেম্বরে দ্য ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস বলেছিল, গত আগস্টে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন শুরু করার পর এক মাসেই মিয়ানমারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ৬ হাজার ৭০০ রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে। প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এখনো তাদের আসা অব্যাহত আছে।

তবে জাতিগত নিধনের এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে মিয়ানমার। গত বছরে নিজস্ব অনুসন্ধানে রাখাইনে নির্যাতনের ঘটনায় মিয়ানমার সেনাবাহিনীর কোনো দোষ খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে দাবি করে।

অবশ্য, গত মাসে মিয়ানমার সেনাদের পক্ষ থেকে রাখাইনে রোহিঙ্গা নিধনের বিষয়টি স্বীকার করে নেওয়া হয়। ইন ডিন নামের একটি গ্রামে রোহিঙ্গাদের একটি গণকবর পাওয়ার কথা স্বীকার করে তারা। সেখানে অনেক রোহিঙ্গা সেনাদের হাতে নিহত হয়েছে।

গত সপ্তাহে মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত ইয়াংহি লি বলেছেন, রোহিঙ্গা সমস্যা ‘গণহত্যার প্রতীক’ হয়ে উঠেছে। তবে জাতিসংঘের অনুসন্ধান মিশনের নেতৃত্বে থাকা ওই কর্মকর্তাকে মিয়ানমারে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

গার্ডিয়ানের সঙ্গে আলাপকালে এইচআরডব্লিউয়ের এশিয়া অঞ্চলের ডেপুটি পরিচালক ফিল রবার্টসন বলেছেন, ‘মুং নুতে ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর অভিযোগ বিষয়ে শুনেছি। বর্মিজ নিরাপত্তা বাহিনীর অত্যাচার গোপন করার ব্যাপক প্রচেষ্টা বিষয়টিতে আমরা উদ্বিগ্ন।’

গত সপ্তাহে বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, রাখাইনের অন্যান্য অংশে বুলডোজার চালিয়ে সমান করে ফেলা হয়েছে। আকাশ থেকে তোলা ছবিতে দেখা গেছে, আগে যেখানে রোহিঙ্গাদের গ্রাম ছিল, সেগুলো পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। গত বছরে যে গ্রামগুলো লক্ষ্য করে সামরিক অভিযান চালানো হয়েছিল, সেগুলো এখন ধূলিসাৎ বলে ওই প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

লিউয়া বলেছেন, ‘শুধু যে বাড়িগুলো পোড়ানো হয়েছিল সেগুলোই নয়, সেখানে পরিত্যক্ত সব বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।’

ঘরবাড়িসহ পুরো এলাকা গুঁড়িয়ে দেওয়া প্রসঙ্গে মিয়ানমার সরকারের মুখপাত্র জাও হাতা বলেন, ‘স্থানীয় সরকার ওই এলাকাগুলো পরিষ্কার করছে। সেখানে কোনো গ্রামবাসী নেই। কোনো ঘরবাড়ি নেই। শুধু সমতল জমি।’

ফেরত আসা রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের জন্য নতুন গ্রাম তৈরি করতে হবে বলে জানান হাতা।

গণকবর ধ্বংস করে ফেলা প্রসঙ্গে জাও হাতা বলেন, ‘আমি জানতে চাই, কোন প্রমাণের কথা আপনারা বলেছেন? এটা কি আরসা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী? বিশ্বজুড়ে বাঙালিরা? আমাকে নির্ভরযোগ্য, নিখুঁত ও শক্তিশালী প্রাথমিক প্রমাণ দিন। বাঙালিরা বিশ্বজুড়ে যা বলে বেড়াচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করে কিছু বলবেন না।’

মিয়ানমার সেনাপ্রধানের বিচার চান যুক্তরাজ্যের এমপিরা

রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা অভিযানের নামে সামরিক অভিযান চালানোয় মিয়ানমারের সেনাপ্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইয়াংয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আন্তর্জাতিক ক্রিমিনাল কোর্টের (আইসিসি) কাছে আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যের ১০০ জনের বেশি এমপি।

যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রসচিব বরিস জনসনের কাছে লেখা এক চিঠিতে তাঁরা বলেছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে মিয়ানমারের অবস্থা তুলে ধরে উচ্চকণ্ঠ হওয়ায় জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের জন্য এটাই উপযুক্ত সময়। লেবার পার্টির সাংসদ রুশনারা আলীসহ ১০০ জনের বেশি সাংসদের স্বাক্ষর রয়েছে ওই চিঠিতে।

তাঁরা বলছেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও তাদের প্রধান হ্লাইয়াংকে তাদের নিরাপত্তা অপারেশনের জন্য অর্থবহ কোনো মূল্য দিতে হয়নি। হ্লাইয়াংয়ের শাস্তি না হওয়ায় এ কাজে তাঁর উৎসাহ বেড়ে গেছে। দেশটির অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে বর্তমান সহিংসতাকে আগ্রাসীভাবে ছড়িয়ে দিচ্ছেন তিনি এবং শান্তিপ্রক্রিয়াকে হুমকির মুখে ফেলছেন।

চিঠিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্য এখন পর্যন্ত কূটনৈতিক নেতৃত্ব দিয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ থেকে বিবৃতি আদায় করেছে এবং মিয়ানমারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে আন্তর্জাতিক জনমত তৈরি করছে। তবে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সব পরামর্শ অবহেলা করেছে মিয়ানমার। এখন সামনে এগোনোর সময়। যদিও জাতিসংঘে নিরাপত্তা পরিষদে রাশিয়া ও চীন আইসিসির কাছে যাওয়ার বিষয়টির বিরোধী, তবু আন্তর্জাতিক জনমত তৈরি করে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করার চেষ্টা করতে পারি। ২৬ ফেব্রুয়ারি ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র কাউন্সিলের বৈঠকের আগে যুক্তরাজ্যের সরকারের কাছ থেকে এটা শুরু হোক।

চিঠিতে আরও বলা হয়, যত দেশকে মিয়ানমারে গণহত্যার বিচারের জন্য পক্ষে পাওয়া যাবে, তত হ্লাইয়াং ও তাঁর সেনাদের শাস্তির আওতায় আনা সম্ভব হবে। এতে বেসামরিক মানুষের ওপর ভবিষ্যতে সামরিক নির্যাতন ঠেকানো যাবে।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র সরকার ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে চুক্তি করে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সব রসদ সরবরাহ বন্ধ, সেনা প্রশিক্ষণসহ সহযোগিতা বন্ধের পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

যুক্তরাজ্যের এমপিরা চাইছেন, জাতিসংঘ যেন মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সর্বশেষ