স্পেশাল

অধ্যক্ষ গোপাল কৃষ্ণ হত্যার মিশনে ছিলো পাঁচ শিবির ক্যাডার, নেতৃত্বে গিট্টু নাছির

প্রকাশিত: ৮:৪০ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৬, ২০২০

অধ্যক্ষ গোপাল কৃষ্ণ হত্যার মিশনে ছিলো পাঁচ শিবির ক্যাডার, নেতৃত্বে গিট্টু নাছির

সানডে ন্যাশনাল ডেস্ক

২০০১ সালের ১৬ নভেম্বর। সকাল সাড়ে ছয়টা। চট্টগ্রাম নগরের জামালখান রোডের শাওন ভবন। ভবনটির দ্বিতীয় তলায় থাকতেন নাজিরহাট কলেজের অধ্যক্ষ গোপাল কৃষ্ণ মুহুরী। তার বাসার গলির মুখে তিন চাকার গাড়ি নিয়ে অপেক্ষায় ছিল দুর্ধর্ষ শিবির ক্যাডার ছোট্ট সাইফুল। বাসার দরজায় অস্ত্র হাতে পাহারায় ছিল তসলিম উদ্দিন মন্টু। বাসায় ঢোকে দুর্ধর্ষ শিবির ক্যাডার গিট্টু নাছির, আজম ও বাইট্টা আলমগীর। সিঁড়িতেই দেখা হয় গোপাল কৃষ্ণ মুহুরীর স্ত্রী উমা মুহুরীর সঙ্গে। তার কাছে জানতে চায়, ‘আমাদের স্যার কোথায়?’।

শব্দ শুনে দরজা খুলে সোফায় এসে বসেন গোপাল কৃষ্ণ মুহুরী। কে এসেছে জানতে চান। তাৎক্ষণিক গোপাল কৃষ্ণ মুহুরীর মাথা লক্ষ্য করে একে ৫৬ রাইফেল থেকে পরপর দুইটি গুলি করে গিট্টু নাসির। সেদিন এভাবেই গিট্টু নাছিরসহ শিবিরের দুর্ধর্ষ পাঁচ ক্যাডারের হাতে বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের শিকার হন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, দক্ষ প্রশাসক, শিক্ষাবিদ ও জনপ্রিয় শিক্ষক গোপাল কৃষ্ণ মুহুরী।

অধ্যক্ষের চেয়ারে বসে নাজিরহাট কলেজের হারানো গৌরব ফেরানো, দুর্নীতি বন্ধ ও মৌলবাদী রাজনীতির উৎখাতই কাল হলো তার জীবনে। বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতা নেওয়ার মাত্র দেড় মাসের মাথায় খুন হন তিনি।

মঙ্গলবার এ হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামির সাজা সংশোধন করে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন আপিল বিভাগ। তারা হলো-তসলিম উদ্দিন মন্টু, আজম ও আলমগীর ওরফে বাইট্টা আলমগীর। মামলার অন্য দুই আসামির মধ্যে গিট্টু নাছির ২০০৫ সালের ২ মার্চ হাটহাজারীতে র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়, ছোট্ট সাইফুল অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে গুলিতে মারা যায়।

মন্টুর জবানবন্দিতে বেরিয়ে আসে খুনিদের নাম

গোপাল কৃষ্ণ মুহুরী হত্যাকাণ্ডটি সারাদেশে সাড়া ফেলে। তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গোপাল কৃষ্ণ মুহুরীর বাসভবনে আসেন। হত্যাকাণ্ডের কিছুদিন পর নগরের ডিসি রোড থেকে একে ৫৬ রাইফেল ও পিস্তলসহ গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারর হয় শিবির ক্যাডার তসলিম উদ্দিন মন্টু। শিবির ক্যাডার নাছিরের দেহরক্ষী ছিল সে। হত্যাকাণ্ডের আগের দিন তার কাপাসগোলার বাসায় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অবস্থান করে কিলিং স্কোয়াডের সদস্যরা। তাকে গ্রেপ্তার অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তৎকালীন নগর গোয়েন্দা পুলিশের এসআই মহিউদ্দিন সেলিম।

বর্তমানে কিশোরগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা পুলিশের এই পরিদর্শক সমকালকে বলেন, ‘অধ্যক্ষ গোপাল কৃষ্ণ মুহুরীর হত্যাকাণ্ডটি দেশব্যাপী আলোচিত ছিল। এমন বর্বর হত্যাকাণ্ডে মানুষ স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিল। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেপ্তারে তৎপর ছিল পুলিশ। প্রথমে অস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গুলিসহ মন্টুকে গ্রেপ্তার করি। আদালতে তার জবানবন্দিতে বেরিয়ে আসে অন্য আসামিদের নাম। এরপর একে একে আজম ও বাইট্টা আলমগীরকে গ্রেপ্তার করা হয়।’

একই অভিযানে থাকা বর্তমানে চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক ইলিয়াছ খান সমকালকে বলেন, ‘মন্টু ছিল দুর্ধর্ষ শিবির ক্যাডার। শিবির ক্যাডার নাছিরের অস্ত্র ভাণ্ডার ছিল তার হাতে। এর আগেও তাকে চট্টগ্রাম কলেজের পরিত্যক্ত একটি কক্ষ থেকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এ মামলার অন্য আসামিদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে খুন হয় শিবির ক্যাডার ছোট্ট সাইফুল। বন্দুকযুদ্ধে মারা যায় গিট্টু নাছির। হাবিব খান ও মহিউদ্দিন ওরফে মহিন উদ্দিন পালিয়ে যায়।’

শিবির ক্যাডার হাবিব খান আগে দুবাইতে থাকলেও এখন কানাডায় অবস্থান করছে বলে জানিয়েছে একটি সূত্র।

যে কারণে খুন হন অধ্যক্ষ মুহুরী

সূত্র জানিয়েছে, ফটিকছড়ির নাজিরহাট কলেজ থেকে পুরো চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করতো শিবির ক্যাডার নাছির। তার অনুসারী ও কলেজের মৌলবাদী এবং দুর্নীতিবাজ কিছু শিক্ষক-কর্মচারী মিলে এ কলেজের বিপুল পরিমাণ সম্পদ লুটেপুটে খেতো। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা কেন্দ্র করে লাখ লাখ টাকার বাণিজ্য হতো এখানে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসলে প্রগতিশীল শিক্ষাবিদ গোপাল কৃষ্ণ মুহুরী অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব নেন। তিনি কঠোরভাবে প্রশাসন পরিচালনা করেন। সবধরণের অনিয়ম দুর্নীতি বন্ধ করে দেন। শিবির ক্যাডার নাছিরকে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেন। কলেজের প্রগতিশীল ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে মৌলবাদি চক্রটি। গোপাল কৃষ্ণ মুহুরীকে হত্যার চক কষেন তারা। আওয়ামী সরকার ক্ষমতা ছাড়ার সঙ্গেই সঙ্গেই হত্যা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে তারা।

তাদের হাতে আরো যত খুন

নব্বইয়ের দশক থেকে চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডের নিয়ন্ত্রক ছিল শিবির ক্যাডার নাছির। তার অনুসারী ছিল গিট্টু নাছির, হাবিব খান, সাজ্জাদ খান, আহমুদুল হক, হুমায়ুন, ইয়াকুব, বাইট্টা আলমগীর, দেলওয়ার হোসেন ওরফে আজরাইল দেলওয়ার, হামিদুলতাহ, ফাইভ স্টার জসিম, সাইফুল ইসলাম ওরফে ছোট্ট সাইফুল, বাইট্টা ইউসুফ, বিলাই সাইফুল, বিডিআর সেলিম, ভাগিনা রমজান, তসলিম উদ্দিন মন্টু, মনজুর আলম ও সারওয়ার আলম। এদের অধিকাংশ বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। কয়েকজন দেশের বাইরে পলাতক আছে। বাকিরা জেলে।

১৯৯১ সালে তাদের হাতে খুন হয় যুবলীগ কর্মী শ্যামল, জাফর এবং দিদার। ১৯৯৭ সালে ওমরগণি এমইএস কলেজ ছাত্রলীগ নেতা এনাম, শহীদ এবং মনসুর। ১৯৯৯ সালে পাঁচলাইশ ওয়ার্ড কমিশনার ও আওয়ামী লীগ নেতা লিয়াকত আলী খান। ২০০০ সালের ১২ জুলাই ব্রাশ ফায়ারে ছয় ছাত্রলীগ নেতাসহ আটজন। একই বছর ছাত্রলীগ নেতা আবুল কাশেম ও আবু তাহের। ২০০৪ সালের ১১ এপ্রিল চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক চেয়ারম্যান কমডোর গোলাম রাব্বানী। একই বছরের ৩০ জুন আভ্যন্ত্মরীণ দ্বন্দ্বে নগরের বালুচরা এলাকায় খুন হয় শিবির ক্যাডার ছোট্ট সাইফুল, তার ভাই আলমগীর ও বোন মনোয়ারা বেগম। এছাড়া ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল কালুরঘাট শিল্প এলাকায় একটি টেপটাইল কারখানা থেকে ৫৬ লাখ টাকা লুটের অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ

ই-মেইল :Sundaysylhet@Gmail.Com
মোবাইল : ০১৭১১-৩৩৪২৪৩ / ০১৭৪০-৯১৫৪৫২ / ০১৭৪২-৩৪৬২৪৪
Designed by ওয়েব হোম বিডি